Categories

এসএসসি পরীক্ষার্থী ২০২৬-এর জন্য একটি হৃদয়স্পর্শী গল্প

রাত ২টা ১৫ মিনিট।

পুরো বাড়ি ঘুমিয়ে আছে। শুধু একটি ঘরে এখনো আলো জ্বলছে।

পড়ার টেবিলে বসে আছে রাফি। সামনে খোলা গণিত বই। একই অঙ্ক গত চল্লিশ মিনিট ধরে চেষ্টা করেও মেলাতে পারছে না সে।

বিরক্ত হয়ে কলমটা ছুড়ে ফেলল।

তারপর নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

“আমি মনে হয় পারব না…”

কথাটা বলেই মোবাইলটা হাতে নিল। ফেসবুকে দেখল, তার এক বন্ধু লিখেছে—

“আলহামদুলিল্লাহ! পুরো সিলেবাস শেষ। এখন শুধু রিভিশন।”

রাফির বুকটা কেমন যেন করে উঠল।

তার তো এখনো অনেক পড়া বাকি!

মনে পড়ল, গত মডেল টেস্টে গণিতে মাত্র ৩৮ পেয়েছিল। সেদিন শিক্ষক খাতা দেওয়ার সময় বলেছিলেন, “রাফি, তোমার কাছে আরও ভালো কিছু আশা করি।”

বাড়ি ফিরে বাবাকে নম্বরটা বলতে পারেনি সে।

বাবা একজন সাধারণ চাকরিজীবী। সংসারের খরচ সামলে ছেলের পড়াশোনার জন্য যতটা পারেন, করেন। নিজের জন্য নতুন জামা কেনেন না অনেক দিন। অথচ রাফির পরীক্ষার ফি, বই কিংবা খাতার জন্য কখনো বলেন না, “এখন টাকা নেই।”

এসব ভাবতে ভাবতে রাফির চোখ আরও ভিজে গেল।

হঠাৎ দরজার কাছে শব্দ হলো।

মা দাঁড়িয়ে আছেন।

“এখনো ঘুমাসনি?”

রাফি তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল, “না মা, একটু পড়ছি।”

মা কাছে এসে মাথায় হাত রাখলেন।

“কী হয়েছে বাবা? মন খারাপ?”

এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না রাফি।

“মা, সবাই কত ভালো পড়ে! আমি কিছুই পারি না। তোমরা আমার জন্য এত কষ্ট করো… আমি যদি ভালো রেজাল্ট করতে না পারি?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ছেলের পাশে বসে বললেন,

“বাবা, আমরা কি কখনো তোকে বলেছি, তোর জিপিএ-৫ পেতেই হবে?”

রাফি মাথা নাড়ল।

“তাহলে এত ভয় পাচ্ছিস কেন?”

“তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলে?”

মা মৃদু হেসে বললেন,

“আমাদের স্বপ্ন শুধু তোর রেজাল্ট না, বাবা। আমাদের স্বপ্ন, তুই একজন ভালো মানুষ হবি। জীবনে কষ্ট এলে পালিয়ে যাবি না। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবি।”

একটু থেমে মা আবার বললেন,

“জানিস, তুই যখন ছোট ছিলি, হাঁটতে গিয়ে কতবার পড়ে গিয়েছিলি? কিন্তু একদিন ঠিকই হাঁটতে শিখেছিলি। আজ একটা অঙ্ক পারছিস না বলে কি তুই হেরে গেছিস?”

রাফি মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

মা তার খাতাটা সামনে এগিয়ে দিলেন।

“আবার চেষ্টা কর। না পারলে কাল স্যারকে জিজ্ঞেস করবি। না বুঝলে দশবার বুঝবি। কিন্তু নিজেকে কখনো বলবি না, তুই পারবি না।”

সেদিন রাতে রাফি আর বেশি পড়েনি।

শুধু খাতার শেষ পাতায় কয়েকটি কথা লিখেছিল—

“আমি সবার চেয়ে ভালো হতে চাই না। আমি গতকালের নিজের চেয়ে ভালো হতে চাই।”

পরদিন থেকে রাফি বদলে গেল।

না, সে হঠাৎ মেধাবী হয়ে যায়নি।

এখনো অঙ্কে ভুল হয়। ইংরেজি গ্রামারে আটকে যায়। পড়া মুখস্থ করেও ভুলে যায়।

কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেছে।

আগে ভুল করলে বই বন্ধ করে দিত। এখন ভুলের কারণ খুঁজে বের করে।

আগে বন্ধুদের নম্বর দেখে মন খারাপ করত। এখন নিজের আগের নম্বরের সঙ্গে তুলনা করে।

আগে ভাবত, “এত পড়া কীভাবে শেষ করব?”

এখন ভাবে, “আজ যতটুকু পারি, ভালোভাবে শেষ করি।”

এভাবেই দিন যেতে লাগল।

একদিন গণিত শিক্ষক রাফির খাতা দেখে বললেন,

“বাহ! আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে তোমার!”

রাফি লজ্জা পেয়ে বলল, “স্যার, এখনো অনেক ভুল হয়।”

স্যার হেসে উত্তর দিলেন,

“ভুল হওয়া সমস্যা নয়, রাফি। ভুল থেকে না শেখাটাই সমস্যা। মনে রেখো, পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার আগে জীবনের খাতায় ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়।”

কথাটা রাফির মনে গেঁথে গেল।

দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা চলে এল।

প্রথম পরীক্ষার সকালে বাবা তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দিলেন।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা শুধু বললেন,

“ভয় পাস না। যা শিখেছিস, মাথা ঠান্ডা রেখে লিখবি। আর মনে রাখিস, তোর রেজাল্ট যা-ই হোক, তুই আমাদের ছেলে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

রাফি বাবার দিকে তাকাল।

আজ প্রথমবার তার মনে হলো, তাকে শুধু ভালো রেজাল্ট করার জন্য নয়, নিজের স্বপ্নের জন্যও লড়তে হবে।

পরীক্ষা শুরু হলো।

সব প্রশ্ন সহজ ছিল না। কিছু প্রশ্নে আটকে গেল। তবু হাল ছাড়ল না।

একটির পর একটি পরীক্ষা শেষ হলো।

তারপর এল সেই প্রতীক্ষার দিন।

এসএসসির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

রাফি কাঁপা হাতে রোল নম্বর লিখল।

স্ক্রিনে ফলাফল ভেসে উঠল।

সে ভালো ফল করেছে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় আনন্দ শুধু নম্বরের জন্য নয়।

তার মনে পড়ল সেই রাতের কথা।

যেদিন সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “আমি পারব না।”

মনে পড়ল মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, বাবার নীরব ত্যাগ, শিক্ষকের উৎসাহ আর নিজের অসংখ্য ভুলের কথা।

সে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

কাঁপা গলায় শুধু বলল,

“বাবা, আমি চেষ্টা করেছিলাম…”

বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

“আমি জানি, বাবা। আমি জানি।”

সেদিন রাফি বুঝেছিল—

জীবনের সবচেয়ে বড় জয় সব সময় ফলাফলের কাগজে লেখা থাকে না। কিছু জয় লুকিয়ে থাকে নির্ঘুম রাতের চেষ্টায়, চোখের পানিতে আর হাল না ছাড়ার সাহসে।


প্রিয় এসএসসি পরীক্ষার্থী ২০২৬,

হয়তো এই গল্পের রাফির সঙ্গে তোমার জীবনের কিছুটা মিল আছে।

হয়তো তুমিও মাঝেমধ্যে বই বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলো। হয়তো মনে হয়, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। হয়তো তোমার বন্ধুরা অনেক এগিয়ে গেছে।

কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—

তোমার বাবা-মা তোমার মুখে শুধু সাফল্যের হাসি দেখতে চান না, তাঁরা দেখতে চান তুমি জীবনের কঠিন সময়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছ।

তাই আজ যদি কোনো অঙ্ক না মেলে, আবার চেষ্টা করো।

কোনো অধ্যায় কঠিন মনে হলে শিক্ষকের সাহায্য নাও।

কোনো পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে নিজেকে শেষ ভেবো না।

মনে রেখো, একটি পরীক্ষার ফলাফল তোমার পুরো জীবনের পরিচয় নয়। তবে এই পরীক্ষার জন্য তোমার নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা আর পরিশ্রম তোমাকে আগামী জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে।

একদিন হয়তো তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাবে। হয়তো পথটা তোমার পরিকল্পনার মতো হবে না। কিন্তু নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলে তুমি অন্তত গর্ব করে বলতে পারবে—

“আমি ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু থেমে যাইনি। আমি ভুল করেছিলাম, কিন্তু শেখা বন্ধ করিনি। আমি ক্লান্ত হয়েছিলাম, কিন্তু স্বপ্নটা ছেড়ে দিইনি।”

আর বিশ্বাস করো, জীবনে এই সাহসটুকুর মূল্য কোনো গ্রেডের চেয়ে কম নয়।

তোমার স্বপ্নের মূল্য আছে। তোমার চেষ্টার মূল্য আছে। আর তোমার জীবনের গল্পটা এখনো অনেক বাকি।

তোমাদের সবার সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনায়—

Md. Sazzadur Rahman
Teacher
Navy Anchorage School and College Khulna